ফ্রিডম বাংলা নিউজ

বুধবার, জুন ১৯, ২০২৪ |

EN

৬ দফা-১দফা-বঙ্গবন্ধু

বাংলা ও বাঙালির পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তির সনদ

মোঃ ফয়জুর রব আজাদ | আপডেট: শুক্রবার, জুন ৭, ২০২৪

বাংলা ও বাঙালির পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তির সনদ

লেখক- মোঃ ফয়জুর রব আজাদ, সদস্য, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

বর্ষ পরিক্রমায় আবারো আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস ৭ই জুন। বাংলা ও বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনকে বেগবান করার পিছনে যে সকল কর্মসূচী, অদম্য স্পৃহা, শক্তি ও সাহস যোগিয়েছে ৬ দফা তার অন্যতম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ও বাঙালির মুক্তি সংগ্রামকে সামনে রেখে যখন একান্ত পরিবেশে কথা বলতেন তখন ডান হাতের পাঁচটি আঙ্গুল ও অন্য হাতের একটি উচু করে দেখিয়ে বলতেন ৬ দফা মানে ১ দফা, বাঙালির মুক্তির স্বাধীনতা।

বাংলা ও বাঙালির স্বাধীনতার বীজ বপনের এই মহান দিবসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পবিত্র আত্মা ও স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছি। 

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শেষে পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পূর্ব পাকিস্তান জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল এবং পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ রপ্তানি হতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে। তবে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা আনুপাতিক ছিল না। বছরের পর বছর পূর্ব পাকিস্তান অঞ্চল ভিত্তিতে ক্রমাগত বৈষ্যম্যের শিকার হওয়ায় গুরুতর অর্থনীতির দীনতার সম্মুখীন হয়। যার ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় ছয় দফা আন্দোলন।

৬ দফা আন্দোলন বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। ১৯৬৬ সালের  ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬ দফা দাবি পেশ করেন।

৬ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় শেখ মুজিবকে বিছিন্নতাবাদী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে তিনি নিজেই ৬ ফেব্রæয়ারি সম্মেলন বর্জন করেন। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ৬ দফা প্রস্তাব এবং দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের কর্মসূচি গৃহীত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান বিরোধীদলীয় সম্মেলনে ৬ দফা পেশ করেন। এরপর ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে “আমাদের বাঁচার দাবি: ৬ দফা কর্মসূচি” শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রচার করা হয়। ২৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ৬ দফা উত্থাপন করা হয় লাহোর প্রস্তাবের সঙ্গে মিল রেখে। ৬ দফা দাবির মূল উদ্দেশ্য-পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র, ৬ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে এই ফেডারেল রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন দিতে হবে। ৬ দফা-দাবি এই কর্মসূচির ভিত্তি ছিল ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব। পরবর্তীকালে এই ৬ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতির স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলন জোরদার হয়। বাংলাদেশের জন্য এই আন্দোলন এতই গুরুত্বপূর্ণ যে একে ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা বাঙালি জাতির মুক্তির সনদও বলা হয়।

৬ দফার মূল বক্তব্য ছিল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় ছাড়া সব ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে থাকবে। পূর্ববাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানে দুটি পৃথক ও সহজ বিনিময়যোগ্য মুদ্রা থাকবে। সরকারের কর, শুল্ক ধার্য ও আদায় করার দায়িত্ব প্রাদেশিক সরকারের হাতে থাকাসহ দুই অঞ্চলের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার আলাদা হিসাব থাকবে এবং পূর্ব বাংলার প্রতিরক্ষা ঝুঁকি কমানোর জন্য এখানে আধা-সামরিক বাহিনী গঠন ও নৌবাহিনীর সদর দফতর স্থাপন।

বাংলার সর্বস্তরের জনগণের মাঝে ৬ দফা ব্যাপক সমর্থন পায়। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ১৯৬৬ সালের ৮ মে নারায়ণগঞ্জে পাটকল শ্রমিকদের এক সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী। তাকে এ ধরনের হয়রানিতে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চার হয়।

৭ জুন আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য নেতার মুক্তির দাবিতে এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন তথা বাঙালি জাতির মুক্তির ৬ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে পূূর্ণ দিবস হরতাল আহবান করেছিল। অভূতপূর্বভাবে সে হরতালে সাড়া দেয় ছাত্র-শ্রমিক-জনতাসহ সারা দেশের মানুষ। হরতাল বানচাল করতে পুলিশ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে মুক্তিকামী মানুষের মিছিলে গুলি চালায়। এতে ঢাকার তেজগাঁওয়ে শ্রমিক নেতা মনু মিয়া ওয়াজিউল্লাহসহ ১১ জন, নারায়ণগঞ্জে সফিক ও শামসুল হক নিহত এবং আহত হন অনেকেই।

সরকারের বিরূপ প্রচারণা ও অত্যাচারে ৬ দফা আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ৬ দফা যখন জনগণের ব্যাপক সমর্থন পায় ঠিক সেই সময় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে অভিযুক্ত করে এক নম্বর আসামি করা হয়। স্বৈরাচারী শাসকেরা ভেবেছিল মামলা দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন নিঃশেষ করে দিবে। কিন্তু হলো তার বিপরীত। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়েরের পর বঙ্গবন্ধু পরিণত হন মহানায়কে।

সরকারের ষড়যন্ত্র ছাত্র-যুব-জনতা ব্যর্থ করে দেয় গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। প্রিয় নেতাকে তারা সেনানিবাসের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনে। মুক্তি পেয়ে তিনি তার ৬ দফা ভিত্তিক আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।

ঐতিহাসিক দিনটি বাঙালির স্বাধীনতা, স্বাধিকার ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের অন্যতম মাইলফলক, অবিস্মরণীয় একটি দিন। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে যেসব আন্দোলন বাঙালির মনে স্বাধীনতার চেতনা ও স্পৃহাকে ক্রমাগত জাগিয়ে তুলেছিল ৬ দফা আন্দোলন তারই ধারাবাহিকতার ফসল। এরই ধারাবাহিকতায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনে বাঙালির অবিস্মরণীয় বিজয়। 

একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চের গণহত্যা এবং ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পথ ধরে দেশ স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যায়। ১৬ ডিসেম্বর ৯ মাসের মুক্তি যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে বিশ^ মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থাপিত ৬৬ সালের ৭ই জুনের ৬ দফার সাথে যেমন এদেশের মানুষ একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন ঠিক তেমনি বাংলাদেশের মানুষ এদেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে তারই আদর্শ ও রক্তের সুযোগ্য উত্তরসূরী জাতির পিতার তনয়া গণতন্ত্রের মানস কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা পোষণ করে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এরই ফলশ্রæতিতে বাংলাদেশ আজ বিশ^ সভায় রোল মডেল।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি উদ্বাস্তু দেশ ও জাতির পুর্নগঠনে বঙ্গবন্ধু এদেশকে নিয়ে যে স্বপ্নের বীজ বপন করে পূর্ণতা দিয়ে যেতে পারেননি তার অনুসৃৃত নীতিমালা অনুসরণের মধ্য দিয়ে তারই সুযোগ্য কন্যা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা প্রতিটি স্তরে একের পর এক সফলতার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনা “দিন বদলের সনদ ও ডিজিটাল” বাংলাদেশের ইশতেহার দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। সময়ের পালাবদলে সব কিছুতেই পরিবর্তন হয়েছে- একটি প্রযুক্তি নির্ভর রাষ্ট্র কাঠামো তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের মধ্যে দিয়ে।

২০১৪ সালে তিনি “এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ” এই ইশতেহার দিয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়েছেন।

২০১৮ সালে তিনি “এবার গ্রাম হবে শহর” এই ইশতেহার দিয়ে নাগরিক জীবনের সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন।

২০২৪ সালের নির্বাচনে দেশরতœ শেখ হাসিনা “স্মার্ট বাংলাদেশ” তথা একটি বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার রূপরেখা দিয়ে টানা চতুর্থ বারের মত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র নায়ক জননেত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া উন্নয়নের প্রতিটি ধাপই বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এদেশের মানুষ তার সুফলও ভোগ করছে।

জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলার যেটুকু অপূর্ণতা রয়েছে তা অচিরেই সফলতার স্বর্ন শিখরে উপনীত হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনায়।

এই মহান দিবসে এটাই হউক আমাদের অঙ্গীকার। 

লেখক- মোঃ ফয়জুর রব আজাদ, সদস্য, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।